ঢাকা থেকে লঞ্চে করে পটুয়াখালী।পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটার রাস্তায় যে পরিমাণ ধুলাবালি খেতে হয়েছে তাতে সকালবেলার নাস্তা না করে বের হওয়াই বোধহয় ভালো ছিল। ড্রাইভার ধুলার হাত থেকে বাঁচার জন্য কাপড় দিয়ে নিজের চেহারা পেঁচিয়ে নিয়েছেন মরুর বেদুইনের স্টাইলে। মনে হয়েছিলো মরুভূমি। তিনটা ফেরি পার হওয়ার দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা আর সারা গায়ে বালু নিয়ে পৌঁছালাম বালুর শহর কুয়াকাটায়।
আমরা এবার এসেছিলাম বঙ্গোপসাগরের সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে যাওয়ার জন্য কিছু তথ্য জোগাড় করার জন্য। যাকে পাই তাকেই জিজ্ঞেস করি এদিকে দেখার মতো আর কোনো সু্ন্দর জায়গা আছে কি না। একজন পূর্বদিক দেখায় তো একজন পশ্চিম দিক দেখায়, কেউ চোখ বড় করে আমাদের দিকে তাকায় তো কেউ চোখের ওপর হাত তুলে দূর সাগরের দিকে নির্দেশ করে, এর মানে যেদিকে মন চায় ঘুরতে পারো!
সারা দিনের জন্য আমরা ভাড়া করলাম মাত্রই সাগর থেকে তুলে আনা একটি ভেজা নৌকা। এতে সওয়ার হয়েই আমরা দেখব, সবুজ-হলুদের মিশেলে তৈরি ম্যানগ্রোভ বন ফাতরার চর, মাছের বসতি নামে পরিচিত শুঁটকিপল্লি, ধবধবে সাদা বালুর লাল কাঁকড়ার দ্বীপ, আর সব কল্পনাকে হার মানানো সবুজে ঘেরা শান্ত নির্জন এক স্নিগ্ধ সৈকত, গঙ্গামতির চর।
শুরু করেছিলাম ফাতরার চর ভ্রমণ দিয়ে। কুয়াকাটার মূল সৈকতকে ডান পাশে রেখে বঙ্গোপসাগরে দোল খেতে খেতে দেখছি গাঙচিলের উড়াউড়ি, একটা মাছ ধরার নৌকা আমাদের পাশ কাটিয়ে মুখ ঘুরিয়েছে শুঁটকিপল্লির দিকে। তার পেছনে গাঙচিলের মিছিল, নৌকা থেকে অপ্রয়োজনীয় যে মাছগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে সেগুলো দিয়েই হচ্ছে তাদের রাজভোজ, হুড়োহুড়ি লুটোপুটিতে যারা পেরে উঠছে না তারা পাখাদুটো আস্তে করে মেলে বসে পড়েছে ধূসর সাগরে। আমাদের মাঝি সঠিক সময়েই নামিয়ে দিলেন ফাতরার বনে। সারাটা বনেই মাটিতে শাঁসমূল জেগে রয়েছে, পর্যটকেরা এলাপাতাড়ি ঘুরতে ঘুরতে বনের ভেতর দিয়ে অনেকগুলো পায়েচলা রাস্তা বানিয়ে ফেলেছেন। অনেকেই বলে ফাতরার বনে নাকি গাছে গাছে হলুদ পাতার ছড়াছড়ি, তেমন কিছু দেখতে না পেলেও একটা পুকুরপাড়ের পুরোটা ঘিরে অনেকগুলো হলুদ নারকেলগাছ দেখলাম, হয়তো এর জন্যই অনেকে একে হলুদ পাতার বন বলেন।
গন্তব্য এবার শুঁটকিপল্লি। অগণিত মাছ সাজিয়ে রাখা হয়েছে খোলা মাঠে। কয়েকটা জায়গায় আবার কিছু মাচা করে মাছগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, জেলেদের কাজ এখানেই শেষ, বাকিটা সূর্যের দায়িত্ব।
শুঁটকিপল্লি থেকে নৌকা চলল কাঁকড়া দ্বীপের উদ্দেশে, ছোট ছোট লাল কাঁকড়ার বিশাল রাজত্ব নাকি এখানে। নৌকা থেকে নেমে সোজা হাঁটা দিলাম সাদা বালুর রাজ্যে। এমন সাদা বালু এর আগে কোথাও দেখিনি, দেখিনি সেদিন কোনো লাল কাঁকড়াও, তাই বলে তাদের বাড়িঘরে চোখ বুলানো তো দোষের কিছু নয়।
এখানকার সৈকতটা খুবই সুন্দর, জনমানব নেই, একেবারে শান্ত। একপাশে রয়েছে গাছের সারি আর সৈকতজুড়ে সাদা ঝিনুকের ছড়াছড়ি। তবে ভরদুপুরে এখানে বেড়াতে সাবধান, কেননা সূর্য তার পুরো উত্তাপ অকৃপণভাবে ঢেলে দেয় এখানে। প্রচণ্ড বাতাসের তোড়ে যখন গাছপালাগুলো সব ধেই ধেই করে নাচছে তখন পড়ন্ত বিকেল প্রায়, সূর্যাস্ত দেখার জন্য তাই ছুট লাগালাম গঙ্গামতির চরে।
ঢেউয়ের দোলায় নাচতে নাচতে হঠাৎ করেই দেখি আমাদের মাঝি নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে চুপচাপ বসে আছেন, শব্দহীন পরিবেশে সমুদ্র দেখার এমন সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমরা তার এই কর্মকাণ্ডের প্রশংসা না করে পারলাম না, তাকে বাহবা দিতেই শুকনো মুখে তিনি জানালেন, ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গেছে! ভয়ে ভয়ে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, এখন কী হবে? তিনি বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই আপনেরা নাইমা হাঁইটা যান। আমি নৌকা ঠেইলা নিয়া আসতেছি!’ আমাদের অবাক করে দিয়ে মাঝি ঝুপ করে সাগরে নেমে গেলেন, কোমরপানি সেখানে! এই হলো গঙ্গামতির শুরু।

গঙ্গামতিকে দুভাগ করে মাঝখান দিয়ে দৌড়ে বনের ভেতরে চলে গেছে একটা মোটাতাজা খাল, তার একপাশে কমলা আর বরইয়ের গাছের সারি আর অন্য পাশে নাম না-জানা গাছের বাড়ি। এখানকার বালি এতই নরম যে খালি পায়ে আলতো করে হাঁটলেও পায়ের স্থায়ী ছাপ পড়ে থাকে পরবর্তী জোয়ার না আসা পর্যন্ত, তার ওপর জমে থাকা পানিতে রুপালি আভা তৈরি করে বিকেলের অস্তগামী সূর্যের আলো। ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুড়ে দৌড়ে বেড়াই বাধাহীন বালুর বুকে, অচেনা চরের অজানা বন হাতছানি দিয়ে ভেতরে ডাকে। সেখানে সবুজের কারখানা, বিশাল বিশাল গাছের গায়ে লেপটে থাকা পরগাছার মতো ইচ্ছে করে নিজেও একটু ঝুলে থাকি এদের মধ্যে। এই বনে বানর আছে, আছে শিয়াল, শূকর, অজগর, আরও আছে নাম না-জানা হাজার হাজার পাখি, আর সামনে রয়েছে চোখের সীমানা ছাড়ানো বঙ্গোপসাগর। এখান থেকেই একই জায়গার দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। এখানে এক সাগরের পানিই একদিনেই দুবার লাল হয়। একবার ভোরের শান্ত স্নিগ্ধ সূর্যোদয়ের সময় আরেকবার বিদায়ী সূর্যের শেষ ছোঁয়াতে।
ইঞ্জিন ঠিকঠাক করে ঠিক সন্ধ্যায় ফিরে আসি আমরা, পেছন ফিরে তাকাই বারবার। আবার আসব গঙ্গামতিতে, পরেরবার তাঁবু নিয়ে আসব, এই সোনালি চরকে রাতের রুপালি আলোয় প্রাণভরে দেখব।
কীভাবে যাবেন
কুয়াকাটায় বাস ও লঞ্চ দিয়ে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত সরাসরি লঞ্চ রয়েছে, ভাড়া ১৮০ টাকা করে। পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটার গাড়ি রয়েছে, ইচ্ছে করলে আপনি মোটরসাইকেলেও যেতে পারবেন। ফেরি পার হতে হবে তিনটা, শেষের দিকে রাস্তা খুবই খারাপ। কুয়াকাটায় নেমে যদি সব জায়গা ঘুরে বেড়াতে চান তাহলে ইঞ্জিনচালিত একটা ছোট নৌকা সারা দিনের জন্য ভাড়া করে নিন, ১০০০-১২০০ টাকার মতো চাইবে। ফেরার পথে কুয়াকাটা থেকেই ঢাকাগামী বাসে উঠে যেতে পারেন। ঢাকা আসার বাস কিন্তু একটাই, আর সেটা কুয়াকাটা ছেড়ে যায় ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়। একবার মিস করলে যতই চেঁচামেচি করেন না কেন, পরদিনের সূর্যোদয় না দেখিয়ে আপনাকে আর ফিরতে দেবে না সাগরকন্যা কুয়াকাটা।
