Search This Blog

Sunday, November 12, 2017

সিমান্ত নদী, পাথর আর পাহাড়ে জাফলং



বৈচিত্র আর আপরুপ সৈন্দ্যর্য বাংলাদেশ, পাহাড় নদী সাগর যা চাই সব আছে এই বাংলার। আমাদের দেশের উত্তর পূর্বের হযরত শাহজালাল (র) আর শাহ পরানের পূর্ণভুমি সিলেট। সিলেট থেকে উত্তরে প্রায় ৬০ কিমি: দূরে জাফলং এবার আমাদের ভ্রমণের যাত্রাপথ। গত কোরবানীর ঈদের রাতে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করি সিলেটের উদ্দেশ্যে। সিলেট শহরে থাকার ব্যবস্থা আগে থেকেই করা ঠিল। ভোরের আলো ফোটার আগেই সিলেট হুমায়ুন চত্তরে বাস আমাদের নামিয়ে দিলো। তখন ভোড় ৩.৩০মিনিট, আমি আর আমার ছোট ভাই নাজমুল হুমায়ুন চত্তরে অপেক্ষা করতে লাগলাম ভোরের আলো ফোটার জন্য। সূর্যি মামা উঠার সাথে সাথে আমরা সিলেট উপশহরে ডরমেটরিতে পৌছাই।
সেখান থেকে আমাদের সাথে যুক্ত হয় সিলেট অফিসের মনির। মনির আমাদের ভ্রমণ সাথী ও গাইড। আমরা  মোট তিনজন সকাল ৯টায় জাফলং এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। সোবহানী ঘাট থেকে বাস সরাসরি যায় জাফলং পর্যন্ত পৌছাতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। সিলেট শহর থেকে একটু বের হতেই পথে শাহ পরান (র) এর মাজার। আর একটু সামনে শ্রীপুর যেতেই দুপাশে সবুজ মাঠ আর ছোট ছোট নদী আর সামনে বিশাল পাহাড়। পাহাড়গুলো হচ্ছে ভারত অংশে কিন্তু বাংলাদেশ অংশ থেকে আমাদের চোখ জুড়ায়। পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য ছোট বড় ঝরনা। বিচিত্র রকামের মানুষের আনাগোনা আর নদী। আপনাকে জাফলং বাজার পর্যন্ত যেতে হবে না। তার আগের মামুর বাজারে বাস থেকে নেমে যেতে হবে। জাফলং বাজার আসলে দেখার মতো কিছুই নেই। মামুর বাজার নেমে পনের থেকে বিশ মিনিট হাটতে হবে। কারণ এই অংশটুকুর রাস্তা ভালো না। আর হাটলেও খুব একটা কষ্ট হবেনা। বাজার থেকে যেতে দু,পাশের বাজার, পাহাড়, পাথরের কারখানা। পাথরের হাট দেখে অনেক মজা পেয়েছি। হাটার ক্লান্তিটুকু আরও ভুলিয়ে দিয়েছে পাটা-পুতার বাজার ও কারখানা। আমাদের ঘরে আগের দিনের শিল পাটাতে মশলা বেটে রান্না করা হতো। সেই শিল পাটা তৈরির একটা কারখানা এখানে রয়েছে। কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে এখানে এই শিল্পটি গঢ়ে উঠে। কিন্তু সেই শিল্পীটি আজ বিলুপ্তির পথে। যারা এখানে কাজ করে তারা চায় না যে তাদের পরের প্রজন্মের কেউ এই পেশায় আসুক। কারন একটাই আগের মত আর পাটাপুতার চাহিদা নেই। পাটাপুতার বাজারের পরই নদী শুরু আর মূলত এখান থেকেই জাফলং এর রুপ শুরু। দুই পাশে পাথরের বিশাল বিশাল স্থুপ। দেখে মনে হচ্ছে পাথরের পাহাড়। ডান দিকে পাথরের পাহাড় আর বাম দিয়ে বয়ে গেছে পিনাই নদী। এই নদী থেকেই তোলা হয় পাথর। যে পাহাড়কে কেন্দ্র করেই এখনে এখানের বানিজ্য। আর সামনে যেটা আছে সেটা বাংলাদেশ ও ভারত সিমান্ত। রাজনৈতিক আবহাওয়া আর প্রকৃতিক আবহাওয়া ভালো হলে আপনি দুই বর্ডার লাইনের মাঝে দাড়িয়ে অন্য রকম সুখ অনুভব করতে পারবেন। পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই ভারত বর্ডারে পা রেখে ছবিতোলার সুখ আলাদা। পিনাই নদীর পাড় হয়ে আপনি অপর পাশ দিয়ে বাংলাদেশ অংশের চা বাগান ও মনিপুরী পাড়া দেখে আসতে পারবেন। নদী থেকে পাথর তোলা হয় সব সমই। কিন্তু ঈদের পরের দিন কোন শ্রমিক কাজ না করায় আমরা পাথর তোলার দৃশ্য দেখার সুযোগ হলো না। নদীতে এক ধরনের বিশেষ নৌকা দিয়ে পাথর তোলা হয়। ঈদের সময় বলে পাথর তোলা হচ্ছেনা তাই, নৌকা গুলো পাড়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অবসর, তাই নৌকার মাঝিরাই পর্যটকদের নদী পার করে অন্য পারে নিয়ে যাচ্ছে। সিমান্ত নদীর পার পৌছানোর পরপরই মাঝিরা আমাদের তাদের নৌকার চড়ার আহবান জানাতে থাকে। আমাদের ভ্রমণ সাথী মনির আমাকে আগের থেকে বলে দিয়েছে এখানে থেকে নৌকায় না উঠার জন্য। কারণ আমরা হেটে হেটে যত যেতে থাকবো ততই ভালো দেখতে পারবো। আবার ইচ্ছে মতো ছবি তুলতে পারবো। পিনাই নদীর সৌন্দ্যর্যে আমি মুগ্ধ। নদীটি ছোট হলে এর সৌন্দ্যর্য অপূর্ব। নদীতে প্রচুর ¯্রােত। পাথর তোলার নৌকা, নদী, পাহার আর আর নীল আকাশ মিলে সে যেন এক অপরুপ দৃশ্য। আর সামনে আছে ভারত অংশে পাহাড়ে সেখানকার আদি বাসিদের রং বেরঙ্গের বাড়ি, রাস্তা আর মানুষ দেখা যাচ্ছে। আরও একটি জিনিস আছে বিচিত্র, সেটা হচ্ছে হেলানো বিশাল একটি পাথর, যতই সামনে যাচ্ছি ততই পাহারটি বড় আর র্স্পষ্ট হতে থাকে। পাথরটি একদিতে হেলানো কিন্তু পরে যাচ্ছেনা।


সিমান্তের মূল ভ‚খন্ডের অনেক আগেই দংশ প্রায় এটি সাইন বোর্ডে লেখা, “বাংলাদেশের সিমান্ত রেখা এই পর্যন্ত শেষ।” কিন্তু আরও সামনে যাওয়া যায়, আমরা গেলাম। আসলে দুপুর দুইটা আগে গেলে যাওয়া যায়। তাও সব সময় না।  তাই আমরা সামনে যেতে থাকি যে দিকে তাকাই শুধু পাহাড় আর পাহাড়।


বাংলাদেশ ভারত সিমান্ত যেখানে ভারতীর সিমান্ত রক্ষী ও বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড সিমান্ত পাহারা দিচ্ছে তার ঠিক আগে সিমান্তটি খুব অদ্ভুত। ছোট একটি পায়ে হাটা নদী যায় এ পারে বাংলাদেশ আর ওপারে ভারত। নৌকায় করে অবশেষে আমরা নদীর পার হই। পার হলে মূল অংশটি ভারতের কিন্তু পা রাখার মত ছোট একটি অংশ আছে বাংলাদেশ। কিছু অস্থায়ী দোকানও আছে। আবার একজন বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড সৈনিকও আছে সিমানা লাইনের এপারে, যাতে কোন বাংলাদেশী ভুল করে ভারতীয় অংশে প্রবেশ না করে ফেলে। এখানে আড়াআড়ি ভাবে বাংলাদেশ ভরত। ভারতে সিমান্ত রক্ষীদের একাটি সিমান্ত চৌকিও আছে। একটি মাত্র লাল সাইন বোর্ড লেখা সামনে ভারত অতিক্রম করা নিষেধ, বিজিবি। এই বোর্ড দিয়ে দুটি দেশের সীমানা আলাদা করা হয়েছে। আমরা দু দেশে দাড়িয়ে ছবি তুলি, মজা করি। ভুলক্রমে ভারত অংশে বাংলাদেশী কেউ ডুকে পরলে বিএসএফ বাশি বাজিয়ে সর্তক করে দেয়। এখানে সাত আটটি ছোট টং ঘরের অস্থায়ী দোকান রয়েছে। এখানে ভারতীয় বিভিন্ন সামগ্রী পাওয়া যায়। আমরা যেমন সীমান্ত দেখতে গিয়েছি তেমনি, ভারতীয় লোকজনও তাদের সিমান্ত দেখতে এসেছে। আমরা যেমন তাদের দেখছি, তারাও আমাদের দেখছে। আর স্থানীয়রা যে যার দৈনিক কাজ নিয়ে ব্যাস্ত। কি অদ্ভুত মাত্র কয়েক হাতের দূরত্ত কিন্তু, দেশ আলাদা ভাষা আলাদা, জাতীয়তা আলাদ। এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। অবশেষে আমাদের ফেরার পালা। আমরা আবার নৌকায় করে নদী পার হয়ে আমাদের ফেরার পথে পা বাড়াই, পিছনে পরে থাকে বাংলাদেশ ভারত সিমান্ত।  

No comments:

Post a Comment